নারীর ইতিহাস

 
















নারীর ইতিহাস

নারীর ইতিহাস হল এমন এক ধরনের শিক্ষা যেখানে নারীরা ইতিহাসে কি ভূমিকা পালন

করেছেন এবং কোন উপায়ে তা করেছেন তা বিবৃত হয়। লিপিবদ্ধ ইতিহাসে নারীর অধিকার 

আদায়ের ইতিহাস, একক এবং দলগতভাবে ইতিহাসে নারীদের গুরুত্ব পর্যালোচনা, এবং তাদের উপর ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর প্রভাব এই শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত। নারীর ইতিহাস শিক্ষায় দেখা যায় অনেক রেকর্ড পাওয়া যায় না বা তাদের অবদান এবং তাদের উপর ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর

প্রভাব উপেক্ষা করা হয়। ফলে নারীর ইতিহাসে অনেক ক্ষেত্রেই সংশোধনের প্রয়োজনীতা দেখা

 যায়।পাণ্ডিত্যের প্রায় সবগুলো কেন্দ্রই যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনে, যেখানে নারীবাদের দ্বিতীয় 

তরঙ্গ সমর্থনকারী ইতিহাসবেত্তারা সামাজিক ইতিহাসের নতুন প্রগতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। নারী স্বাধীনতায় সক্রিয় কর্মীরা নারীদের অভিজ্ঞতালব্ধ অসমতা ও নিপীড়ন নিয়ে আলোচনা

ও বিশ্লেষণ করে থাকেন। তারা মনে করেন তাদের পূর্বনারীপ্রজন্মের জীবন থেকে শিক্ষা নেয়াটা বাধ্যতামূলক। ইতিহাস মূলত লেখা হয়েছে পুরুষের হাতে এমনকি গণপরিবেশের যুদ্ধ, রাজনীতি, কূটনীতি এবং প্রশাসননীতিতেও পুরুষের সক্রিয়তার গল্পই উঠে এসেছে।

অঞ্চলসমূহ

আফ্রিকা

আফ্রিকারবিভিন্ন দেশের নারীর ইতিহাস নিয়ে কয়েকটি ছোট-খাট গবেষণা হয়েছে। এছাড়াকয়েকটি দেশ ও অঞ্চল, যেমন নাইজেরিয়া ও লেসথোর

নারীর ইতিহাসের উপর বেশ কয়েকটি গবেষণা হয়েছে।পণ্ডিতগণঅভিনব সূত্রের ভিত্তিতে 

আফ্রিকার নারীদের ইতিহাস নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেছেন, যেমন মালাউয়ির গান, 

সকটোর বুনন কৌশল, এবং ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান।

আমেরিকা

নারীরাএককভাবে নারীর ইতিহাস রচনা ছাড়াও নারীর ইতিহাস রচনায় প্রথম দলবদ্ধ প্রচেষ্টা ছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইউনাইটেড ডটার্স অফ দ্য কনফেডারেসি (ইউডিসি) থেকে।

এসময়েযখন পুরুষ ইতিহাসবেত্তাগণ যুদ্ধ ও সেনাপতিদের ইতিহাস রচনায় ব্যস্ত, ইউডিসি 

প্রচেষ্টায় নারীদের গল্প সংগ্রহ করে। নারীরানারীবাদী কার্যক্রম, কর্মদক্ষতা ও নেতৃত্বের উপর 

জোর দেন। তাদেরপ্রতিবেদনে উঠে আসে যখন পুরুষগণ যুদ্ধে চলে গেলে নারীরা দায়িত্ব গ্রহণ

করত, খাদ্য অন্বেষণ করত, ফ্যাক্টরিতে তৈরি পোশাক অপর্যাপ্ত হলে চরকা দিয়ে পোশাক তৈরি, এবং কৃষি জমি ও উদ্যানের কাজ পরিচালনা করত। তারাপুরুষরা না থাকার ফলে বিপদের

সম্মুখীন হত।

 

 

ইউরোপ

উনবিংশও বিংশ শতাব্দীতে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যেমনআইনে নারীদের 

সমঅধিকার রক্ষিত হয়েছে। নারীরাযুগ যুগ ধরে গৃহস্থালীর কাজ, সন্তান জন্ম ও লালন পালন, সেবিকা, মা, স্ত্রী, প্রতিবেশী, বন্ধু ও শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছে।যুদ্ধকালীনসময়ে নারীদের দিয়ে শ্রম বাজারে এমন কাজও করানো হয়েছে যা পুরুষদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল।

যুদ্ধপরবর্তী সময়ে তারা তাদের চাকরি হারায় এবং তাদের পুনরায় গৃহস্থালী ও সেবামূলক কাজে নিয়োজিত হয়।

ফ্রান্স

ফরাসিইতিহাসবেত্তাগণ এক ধরনের অভিনব কৌশল গ্রহণ করেছে।ফ্রান্সেনারী ও জেন্ডার শিক্ষা বিষয়ক প্রোগ্রাম বা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন আলাদা বিভাগ না থাকলেও নারী ও জেন্ডার ইতিহাস 

নিয়ে বিশদ গবেষণা হয়েছে।কিন্তুঅন্যান্য একাডেমিকদের সামাজিক ইতিহাস ভিত্তিক গবেষণায়গৃহীত কৌশলও নারীর ইতিহাসের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। নারীও জেন্ডার ইতিহাস নিয়ে বেশি 

মাত্রার গবেষণা ও প্রকাশনার কারণ হিসেবে ফরাসি সামজের উচ্চ আগ্রহকে দেখানো হয়েছে।

ইউরোপীয়ইউনিয়ন গঠনের ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির ফলে ফ্রান্সে জেন্ডার

ইতিহাস বিষয়ের গবেষণার ক্ষেত্রে বৈষম্যের হার পরিবর্তিত হচ্ছে এবং অনেক ফরাসি পণ্ডিতগণ ইউরোপেরবাইরেও নিয়োগ খুঁজছেন।

এশিয়া

 

এশিয়ারইতিহাসে নারীর ভূমিকা অল্প, তবে বিশেষজ্ঞরা চীন, জাপান, ভারত, কোরিয়া ও

অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী দেশের নারীদের অবদানের উপর জোর দিয়ে থাকেন।

 

চীন

বিভিন্নমাধ্যমে প্রকাশিত কাজে বিপ্লবে নারীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ, নারী মুক্তির পথ হিসেবে

তাদের কর্মসংস্থান, নারীর উপর শোষণের উৎস হিসেবে কনফুসীয় ও পারিবারিক সংস্কৃতি 

লিপিবদ্ধ হয়।গ্রাম্যবিবাহ প্রথা, যেমন যৌতুক এখনো আগের মতই থাকলেও এর কিছু পরিবর্তনও এসেছে।যৌথপরিবার ভেঙ্গে একক পরিবার গড়ে ওঠছে এবং বিবাহ চুক্তিতে নারীর এজেন্সি বাড়ছে।চীনেসাম্প্রতিক একটি গবেষণায় লিঙ্গ বিষয়ক তত্ত্বের উপর ইংরেজি ও চীনা ভাষার

রচনায় প্রচুর নতুন তথ্য পাওয়া যায়।

 

জাপান

জাপানীনারীদের ইতিহাস ঐতিহাসিক গবেষণায় উঠে আসে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে। 

১৯৪৫সালের পূর্বে নারীর ইতিহাস নিয়ে কোন আলোচনা হয় নি, এমনকি এর পরেও অনেক 

জাপানী ইতিহাসবেত্তাগণ জাপানী ইতিহাসের অংশ হিসেবে নারীর ইতিহাসকে গ্রহণ করতে 

অনিচ্ছুক ছিলেন।১৯৮০এর দশকের নারীর প্রতি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে আসতে থাকে, জাপানী নারীর ইতিহাস লেখনের সুযোগ দেওয়া হয় এবং নারীর ইতিহাসকে 

একাডেমিক পাঠ্যক্রম হিসেবে গ্রহণ করা হয়।১৯৮০এর দশকে নারীর ইতিহাসের উপর বেশ কিছু রোমাঞ্চকর ও নতুন গবেষণা করা হয়।এইগবেষণার বেশির ভাগই করেন একাডেমিক 

নারী ইতিহাসবেত্তাগণ। পাশাপাশিস্বেচ্ছাসেবী লেখক, সাংবাদিক, ও আনাড়ি ইতিহাসবেত্তাগণও

এই ধরনের গবেষণা করেন। 

অধিকার ও সমতা

নারীঅধিকার বলতে নারীর সামাজিক ও মানবিক অধিকারসমূহকে বোঝায়।

কর্মসংস্থান

১৮৭০সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি প্রথম বিভিন্ন পেশায় জড়িত নারীদের সংখ্যা

গণনা করে এবং নারীর ইতিহাসের চিত্র প্রকাশ করে। এতেদেখা যায় ভিক্টোরিয়ান যুগের সকল মার্কিন নারীরা তাদের মধ্যবিত্ত পরিবারে বা কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ছিলেন না। মোটকর্মীর মধ্যে

নারীর সংখ্যা ১৫% (১২.৫ মিলিয়নের মধ্যে ১.৮ মিলিয়ন)। তাদেরএক তৃতীয়াংশ ফ্যাক্টরির 

কাজেনিয়োজিত ছিল এবং বাকিরা শিক্ষা দান, কাপড়বুনন, দর্জির কাজে নিয়োজিত ছিল।

সেসময়ের দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষক ছিল নারী। তাদেরমধ্যে লোহা ও ইস্পাতের কাজে ৪৯৫ জন, 

খনিতে ৪৬ জন, করাত কলে ৩৫ জন, তেল কূপ ও শোধনাগারে ৪০ জন,গ্যাসের কাজে ৪ জন 

এবং কাঠকয়লার ভাঁটিতে ৫ জন, জাহাজের কাজে ১৬ জন, টিমস্টার হিসেবে ১৯৬ জন, তার্পিন

 তেল শ্রমিক হিসেবে ১৮৫ জন, পিতল শ্রমিক হিসেবে ১০২ জন, নুড়িও লেদমেশিন নির্মাতা হিসেবে 

৮৪ জন, স্টক-হার্ডার হিসেবে ৪৫ জন, বন্দুক ও তালা মিস্ত্রীহিসেবে ৩৩ জন, শিকারী ও ফাঁদপাতার

 কাজে ২ জন নিয়োজিত ছিল।এছাড়া৫ জন আইনজীবী, ২৪ জন দন্তবিদ, এবং ২,০০০ জন ডাক্তার ছিল।

ধর্ম

গতদুই শতাব্দীতে সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে ইসলাম, ইহুদি, খ্রিস্টান, শিখ, ও হিন্দু ধর্মে নারী সম্পর্কিত মতের ভিন্নতা দেখা গেছে।চার্চেনারীদের ভূমিকা বেশির ভাগ ইতিহাসেই উপেক্ষা বা অস্বীকার করা হয়েছে।

বিবাহের বয়স

নারীরবিবাহের বয়স সমাজে তাদের অবস্থান বোঝাতে একটি মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়।নারীরবিবাহের বয়স অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা পালন করে।কারণযে দেশে নারীর বিবাহের বয়স বেশি সে দেশের নারীরা অধিক সময় মানব সম্পদ হিসেবে অর্থনীতিতে ভূমিকা পালন করে থাকে। বিশ্বেনারীদের বিবাহের বয়সের গড় বাড়ছে।

মহামন্দা

আধুনিকবিশ্ব মহামন্দা ছড়িয়ে পড়লে পুরুষদের বেকারত্ব, দারিদ্র, ও পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতার প্রয়োজনে নারীদের উপর চাপ সৃষ্টি হয়। নারীদেরপ্রাথমিক দায়িত্ব ছিল গৃহস্থালীর কাজ করা।পারিবারিকআয়ের কোন নির্দিষ্ট উৎস না থাকায় নারীদেরও খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করতে হয়।পরিবারেরভরণপোষণের দিকে নজর দিতে গিয়ে সন্তান না নেওয়ায় প্রায় সব স্থানে জন্মহার কমতে থাকে।১৪টি বড় দেশে জন্মহারের গড় কমে দাড়ায় ১২%, যেখানে ১৯৩০ সালে প্রতি হাজারে জন্ম হার ছিল ১৯.৩% তা ১৯৩৫ সালে ১৭% নেমে আসে।কানাডায়অর্ধেকের বেশি রোমান ক্যাথলিক নারী চার্চের শিক্ষাকে অমান্য করে এবং জন্মহার রুখতে গর্ভনিরোধক ব্যবহার করে।

যুদ্ধবিগ্রহ

যুদ্ধবিগ্রহেসবসময় নারীরা লাঞ্ছিত হয়েছে এবং অন্যদের তাদেরকে আশ্রয় ও সহয়তা প্রদান করতে হয়েছে।বিংশশতাব্দীতে নারীদের গৃহস্থালীর কাজের বাইরেও যুদ্ধের সহায়তামূলক কাজ, যেমন যুদ্ধের উপকরণ প্রস্তুতকারী, পুরুষদের স্থলে সেবামূলক কাজ, সেবিকা, এমনকি সেনা দলেও কাজ করতে হয়েছে|


Post a Comment

Previous Post Next Post